ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে অতি জোয়ারে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে বনের হরিণ, বানর, বাঘসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণির ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা করছে বনবিভাগ। এ ছাড়া বন্যপ্রাণিদের মিঠা পানির উৎস পুকুরে লোনা পানি ঢুকে পড়ায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগে দুই রেঞ্জ। শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জ। এই দুটি রেঞ্জের কটকা, কচিখালী, দুবলা, আলোরকোল, কেকিলমনি, হিরণ পয়েন্ট, মান্দারবাড়িসহ বনের বিভিন্ন এলাকায় বন্যপ্রাণির অবাধ বিচরণ রয়েছে।
বাগেরহাটের করমজল কুমির প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজার কবির বলেন, রিমালের প্রভাবে জলোচ্ছ্বাসের পানিতে প্লাবিত হয়েছে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকা। এতে পূর্ব ও পশ্চিম বনাঞ্চলের বেশিরভাগ এলাকা এখন তলিয়ে আছে। ফলে বনের হরিণ, বানর, রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণির প্রাণহাণির আশঙ্কা রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু রায়হান মোহাম্মদ আল-বিরুণী বলেন, রিমালের প্রভাবে উপকূলীয় বাগেরহাটের প্রধান প্রধান নদ-নদীগুলোতে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবাহিত হচ্ছে। নদীগুলোতে দুই থেকে পাঁচ ফুট পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পায়।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগীয় বনসংরক্ষণ কর্মকর্তা নূরুল করিম (ডিএফও) ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনকে বলেন, রিমাল ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকা জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে। ঝড়ের প্রভাবে বঙ্গোপসাগরে পানির অস্বাভাবিক চাপ ছিল। রোববার দুপুরে জোয়ারের পানি সুন্দরবনের সব নদ-নদীতে প্রবাহিত হয়। সেই পানির উচ্চতা ছিল পাঁচ থেকে আট ফুট পর্যন্ত। সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলের অধিকাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। বনের প্রাণিকুলের আবাসস্থল তলিয়ে যাওয়ায় প্রাণিকুলের প্রাণহানির শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
এদিকে বনের মিষ্টি পানির একমাত্র আধার শতাধিক পুকুর তলিয়ে গেছে। বনকর্মী ও প্রাণিকুল ওই পুকুরের পানি পান করে থাকে। এতে করে মিষ্টি পানির একটা সংকট তৈরি হবে। দুর্যোগ চলে যাওয়ার পর প্রাণিকুলসহ অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে খোঁজ নিয়ে বিস্তারিত বলতে হবে। তবে ঘূর্ণিঝড় রিমালের পূর্বাভাস পেয়ে মাটি হতে আট থেকে দশ ফুট উঁচু বেশ কয়েকটি কিল্লা তৈরি করা হয়েছে। বন্যপ্রাণিরা সেগুলোতে আশ্রয় নিতে পারবে বলে জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।
গতকাল সোমবার দুবলার চর এলাকা থেকে একটি মৃত হরিণ উদ্ধার হয়। ধারণা করা হচ্ছে জলোচ্ছ্বাসে মারা গেছে প্রাণিটি। দুর্যোগ কেটে গেলে ক্ষয়ক্ষতির বিষয় জানা যাবে বলছেন কর্মকর্তারা।
অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় রিমাল স্থল গভীর নিম্নচাপ আকারে দুর্বল হয়ে সোমবার বাংলাদেশ পার হলেও উপকূলে রেখে গেছে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন। আর দুর্বল হওয়ার পরও বহু সময় ধরে চলে এর তাণ্ডব। গতিবেগের ওঠা–নামাও ছিল বড় ব্যবধানে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে ভয়াবহ ঘর্ণিঝড়গুলোর মধ্যে অন্যতম সিডর, আইলা। কিন্তু সেসব ঘূর্ণিঝড় যতটা সময় ধরে উপকূলে তাণ্ডব চালায়, তারচেয়ে বেশি সময় ধরে চলে প্রবল ঘূর্ণিঝড় রিমালের তাণ্ডব।
রোববার রাত ৮টার দিকে উপকূলে আছড়ে পড়ার পর, ১৩ ঘণ্টা ধরে ব্যাপক শক্তি নিয়ে চলে ধ্বংসযজ্ঞ। ফুঁসে ওঠা নদীর পানিতে প্লাবিত হয় জনপদ। সোমবার সকালে দুর্বল হওয়ার পরও এর প্রভাব উপকূলীয় এলাকায় ছিল লক্ষ্যণীয়। বাঁধে ভাঙন-জলোচ্ছ্বাসের কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বিভিন্ন জেলায়।
ঘূর্ণিঝড় রিমালের আচরণ ছিল অন্য ঝড়ের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি দুর্বল হয়ে সোমবার ভোর ৬টায় প্রবল ঘূর্ণিঝড় থেকে ঘূর্ণিঝড়ে এবং পরে স্থল গভীর নিম্নচাপে রূপ নেয়। কিন্তু তারপরও দিনভর ঝোড়ো হাওয়া আর বৃষ্টি চলে দেশজুড়েই।



