সাত পর্বে ৮১ দিন ধরে চলা ভোটযুদ্ধের আজ অন্তিম পর্ব। কিছু সময়ের মধ্যে পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, ভারতের শাসনভার আগামী পাঁচ বছরের জন্য কার হাতে থাকবে। মোদ্দা কথা নরেন্দ্র মোদি হ্যাটট্রিক করবেন, না আউট হবেন, তা নিশ্চিত হবে। এই একটি মাত্র জাতীয় বিষয়। গত ৭২ বছরে এই প্রথম লোকসভা নির্বাচনে তেমন কোনো জাতীয় ইস্যু নেই। ভোটের হাওয়া না থাকায় ভোটারের মতিগতি বোঝা ভার। আর ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমও এতটাই একপেশে যে, সেখান থেকে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া কঠিন বলাটা ঠিক হবে না, উচিতই নয়।
সাধারণ ভারতীয়দের মনে যে বিপুল আশা জাগিয়ে মোদি ২০১৪ সালে ভারতের ক্ষমতায় বসেছিলেন, তার অনেক কিছুই গত ১০ বছরে বকেয়া থেকে গেছে। দুর্নীতি দমনে তাঁর যে অঙ্গীকার ছিল, তা বিরোধী দল দলনে পর্যবসিত হয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত এনে ভারতীয়দের ব্যাংক হিসাবে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি এখন কেবলই গল্প। বরং তাঁর আমলে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে অর্থ চলে গেছে দেশের বাইরে। জিনিসপত্রের দাম লাগামছাড়া। কৃষক উৎপাদিত পণ্যের মূল্য পাচ্ছে না। অথচ ২০১৬ সালে নরেন্দ্র মোদি ঘোষণাই দিয়েছিলেন, স্বাধীনতার ৭৫ বছরে; অর্থাৎ, ২০২২ সালে কৃষকের আয় দ্বিগুণ করে দেবেন। কিন্তু তা তো হয়নি। বরং বিতর্কিত কৃষি বিল নিয়ে আন্দোলন করতে গিয়ে বহু কৃষকের প্রাণ গেছে। শেষ পর্যন্ত সেই কৃষিবিল প্রত্যাহারে বাধ্য হয়েছিল মোদি সরকার। গত ১০ বছরে বলতে গেলে নরেন্দ্র মোদির এই একটিই পরাজয়, আর তা কৃষকদের কাছে।
তারপরও ঘোষণামতো অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের স্থানে রামমন্দির নির্মাণ, জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক সুবিধা ৩৭০ ধারা বিলোপ, বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন পাস–হিন্দুত্বের চড়া ভিয়েনে অনেক উপাদেয় উপহার দিয়েছে মোদিকে। তাই হাজারো না পারার মধ্যে ভারতের বৃহত্তর হিন্দু জনমানসে নরেন্দ্র মোদি এখনো প্রবাদপ্রতিম জায়গা করে আছেন। যে কারণে নিজের ‘জৈবিক জন্ম হয়নি’ বা নিজেকে ‘ঈশ্বরের অবতার’ দাবি করলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তা নিয়ে সন্দেহ বা বিস্ময়ের উদ্রেক কমই হয়। কারণ, তারা কম-বেশি এই ভাবমূর্তিতেই মোদিকে দেখতে আগ্রহী।
লাভ-ক্ষতির এই খতিয়ানে নরেন্দ্র মোদির অবস্থান যাই থাকুক না কেন, তা তাঁকে নির্বাচনী বৈতরণী পার করে দেবে, এটা বলা ক্রমেই শক্ত হয়ে যাচ্ছে। যদিও মোদি-সমর্থক গোদি মিডিয়া এবং এক শ্রেণির বিশ্লেষক ইতিমধ্যে মোদির দল বিজেপিকে তিন শ পার করে দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বিরোধী দলগুলো এবার যেভাবে সমানে টক্কর দিচ্ছে, তাতে ওই ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে সন্দেহ গভীর হয়েছে। বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের শেষ মুহূর্তের লক্ষ্য ভোটগণনার সময় যেন কোনো অনিয়ম নির্বাচন কমিশন না করতে পারে। এর জন্য ব্যাপকভাবে প্রস্তুত বলে তারা ঘোষণা দিয়েছে। রাহুল গান্ধী ও অখিলেশ যাদবের মতো ইন্ডিয়া জোটের নেতারা বুথফেরত সমীক্ষার ফলাফলকে পাত্তা না দেওয়ার জন্য নেতা-কর্মী-সমর্থকদের নির্দেশ দিয়েছেন।
দুই পক্ষের যত প্রস্তুতিই থাকুক না কেন, একপক্ষ যে হারবে, তাতে তো কোনো সন্দেহ নেই। ধরেই নেওয়া যাক নরেন্দ্র মোদি ২৭২টির বেশি আসন পেয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় বসলেন। তাহলে কী হতে পারে? তাঁর সরকার গত ১০ বছর ধরে যে নীতি অনুসরণ করে চলেছিল, সেটাই করবে। অভ্যন্তরীণ বা পররাষ্ট্র বিষয়ে নীতির বড় কোনো পরিবর্তন হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে কি নতুন কিছু পাবে না ভারতবাসী মোদির তৃতীয় দফায়। অবশ্যই পাবে। যেমন বিহারে মোদি গ্যারান্টি দিয়ে এসেছেন, তিনি জিতলে আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদবকে জেলে ঢোকাবেন। কেজরিওয়ালের দাবি, মোদি তৃতীয়বার এলে শুধু তিনি বা হেমন্ত সোরেন নন অখিলেশ, তেজস্বী, উদ্ধব, স্ট্যালিন, মমতা, এমনকি রাহুলকেও জেলে যেতে হবে। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে বিদায় নিতে হবে যোগী আদিত্যনাথকে।
নতুন মোদি সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় কাজ হবে ডিলিমিটেশন বা লোকসভার আসন সংখ্যা বাড়ানো। এখন যে ৫৪৩ আসনের লোকসভা আছে, তাকে বাড়িয়ে ৭৫৩ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য সংসদের নতুন ভবনেরও উদ্বোধন করেছেন মোদি। সেখানে আট শর বেশি এমপি একসাথে বসতে পারেন। আর এই আসন সংখ্যা বাড়ানো হবে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে। উত্তর ভারতের হিন্দিভাষী রাজ্যগুলোতে; যেখানে বিজেপির একাধিপত্য, সেখানে বাড়বে অনেক বেশি। এনডিটিভির ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, লোকসভার আসন বাড়ানোর যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেখানে উত্তর প্রদেশে ৮০টি আসন বেড়ে হবে ১২৮; অর্থাৎ, ৪৮টি আসন বাড়বে। বিহারে ৪০ থেকে হবে ৭০; মধ্যপ্রদেশ ২৯ থেকে ৪৭, মহারাষ্ট্র ৪৮ থেকে ৬৮, রাজস্থান ২৫ থেকে এক ধাক্কায় ৪৬, গুজরাট ২৬ থেকে ৩৯ এবং পশ্চিমবঙ্গ ৪২ থেকে ৫৩। অর্থাৎ, বর্ধিত ২১০টি আসনের মধ্য ১৫৭টি আসন বাড়বে মাত্র সাতটি রাজ্যে। আর এই রাজ্যগুলোতে বিজেপির একাধিপত্য লক্ষ্যণীয়। অন্যদিকে দক্ষিণ ভারতের দিকে দেখুন। সেখানে বাড়বে তামিলনাড়ুতে দুটি, অন্ধ্রপ্রদেশে তিনটি, তেলেঙ্গানায় তিনটি ও কর্ণাটকে আটটি। আর কেরালায় একটি আসন কমে ২০ থেকে ১৯ হবে।
এই চিত্র থেকে পরিষ্কার বিজেপি নেতৃত্ব ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যেতে দক্ষিণ ভারতের ওপর কোনো ধরনের নির্ভরশীলতা রাখতে রাজি নয়। প্রথম সাতটি রাজ্যের পাশাপাশি আসাম, হরিয়াণা, ছত্তিশগড়, দিল্লি, উত্তরাখণ্ড—এমন কিছু রাজ্য থাকলেই তারা সহজে ৩৭৭-এ ক্ষমতার যাওয়ার ম্যাজিক ফিগারে পৌঁছে যাবে। এতে ক্ষমতা আরও বহুকাল স্থায়ী করা সম্ভব হবে বলে নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহরা মনে করছেন।
কিন্তু উল্টোটা হলে কী হবে? ইন্ডিয়া জোট যদি সত্যিই গরিষ্ঠতা পায়, তাহলে তাদের ঘাড়ে বিপুল দায়িত্বের বোঝা এক ধাক্কায় এসে পড়বে। প্রথম দায়িত্ব একজন উপযুক্ত নেতা ঠিক করা, যিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সবাইকে নিয়ে, সবাইকে সন্তুষ্ট করে চলতে পারবেন। তাঁর সামনে বিজেপির বড় বাঘ সব সময় ক্ষমতার ক্ষুধা নিয়ে বসে থাকবে। জোটে ২৫-২৬টি দল থাকলে তাদের নেতাদের প্রাপ্ত মর্যাদা দেওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দুই, জোটের সবই আঞ্চলিক দল। তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব এজেন্ডা আছে। সে দিকে জোট নেতাকে সব সময় খেয়াল রাখা বাধ্যতামূলক। তিন, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক। বিজেপি বিভিন্ন রাজ্যে রাজ্যপালদের দিয়ে ভিন্নমতের সরকারের ওপর যে অসাংবিধানিক চাপ গত ১০ বছর ধরে তৈরি করে আসছে, তার অবসান চাইবে সব দল। ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো অক্ষুণ্ন ও মজবুত রাখার জন্য রাজ্য সরকারগুলোর কথা শোনার কোনো বিকল্প নেই। এই যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় প্রথম আঘাত এসেছিল ইন্দিরা গান্ধীর আমলে। বিজেপি একে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছে। একে ঠিক করতে হলে অবশ্যই ইতিহাসকে স্বীকার করতে হবে কংগ্রেসকে।
ঘরের মাঠে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আসবে কর্মসংস্থান। লোকসভা নির্বাচনে মোদির ব্যর্থতা হিসেবে এবং নিজেদের প্রতিশ্রুতি হিসেবে যে কর্মসংস্থান প্রশ্নকে পাখির চোখ করেছে ইন্ডিয়া জোট, দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ পেলে তাই করে দেখাতে হবে তাকে। পাশাপাশি আদান–আম্বানির মতো বড় ব্যবসায়ী গ্রুপগুলোর সঙ্গে মিলে মোদি সরকারের দুর্নীতির যে ফিরিস্তি কংগ্রেসের রাহুলসহ জোটসঙ্গী অন্য দলের নেতারা তুলে ধরেছেন বিভিন্ন সময়ে, তা নিয়ে তারা কী করে, সেদিকেও চোখ থাকবে সবার। এর সঙ্গে আছে কৃষকদের সংকট সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়ার চ্যালেঞ্জ।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ভারতে সব রাজনৈতিক দলের মধ্য মোটামুটি মতৈক্য আছে। ইন্ডিয়া জোট সরকার ক্ষমতায় এলেই ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। তবে পাকিস্তান ও চীনের সাথে সম্পর্কের বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, রাহুল গান্ধীসহ ইন্ডিয়া জোটের নেতারা ভারতের ভূমি চীন দখল করে রেখেছে বলে অভিযোগ করে আসছেন। হারানো সেই জমি কীভাবে উদ্ধার হবে, সে প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। আমেরিকা ও রাশিয়ার সাথে ভারসাম্য রক্ষা করেই চলবে ইন্ডিয়া সরকার। কিন্তু কানাডায় এক শিখ নেতাকে হত্যা এবং আমেরিকায় আরেক শিখ নেতাকে হত্যার সাথে ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মাকর্তাদের জড়িত থাকার বিষয়টি কীভাবে সামলাবে–সেটা নতুন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা।
আসলে বিজেপির নেতৃত্বে এনডিএ বা কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইন্ডিয়া–যে জোটই আজ জিতুক না কেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্য তার প্রভাব কমই পড়বে। এর মূল প্রভাবই ভারতের অভ্যন্তরীন রাজনীতি ও শাসন ব্যবস্থায়, যা দেশটির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করবে।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]
আরও পড়ুন:
- মুসলমানেরা কাকে ভোট দেয়
- কাকে ভোট দিলেন মোদি?
- বিতর্কিত কমিশন, ভরপুর আশঙ্কা
- নির্বাচনকে হিন্দু–মুসলিম সংঘাতে পরিণত করতে চান মোদি
- এ ক্ষেত্রেও প্রথম মোদি
- মুসলমানরাই মোদির শেষ ভরসা?
- এত উদাসীন কেন ভারতের ভোটারেরা
- মোদি আবার মুসলিম বিরোধিতায় ফিরলেন?
- মোদি-বিরোধীরা এতটা ছন্নছাড়া কেন?
- মুসলমানদের নিয়ে যা বললেন মোদি, ভারতে বিতর্ক


বিকিয়ে যাওয়া সংবাদমাধ্যম ও মোদির জয়ের সম্ভাবনা
